বিশেষ প্রতিনিধি: দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি কৌশলগত রূপরেখা তৈরি করেছে সরকার। এতে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণ, এলএনজি আমদানির অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০৩১ সালের মধ্যে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
সরকারের কৌশলগত ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী, খুলনা ও বরিশালে দুটি নতুন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) টার্মিনাল বা ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে ৪০০ মেগাওয়াটের একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী ও পায়রায় দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আরও একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে।
গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে নতুন পাইপলাইন নির্মাণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বড় পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরির কথাও বলা হয়েছে। তবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কীভাবে দূর করা হবে, প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা কীভাবে বাড়ানো হবে এবং এসব সংস্কার কখন ও কীভাবে বাস্তবায়িত হবে—এ বিষয়ে ফ্রেমওয়ার্কে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তার অর্থ শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ নয়। বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষতা বাড়ানো, স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধি, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে সংস্কার না করে নতুন প্রকল্পে বেশি গুরুত্ব দিলে ভবিষ্যতে সরকারের আর্থিক দায় আরও বাড়তে পারে।
বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। সরকারের হিসাবে, বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। ফলে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদনে না থাকলেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তাদের সক্ষমতার জন্য অর্থ দিতে হচ্ছে।
অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার কারণে প্রতিবছর প্রায় ১৫০ থেকে ১৮০ কোটি ডলার ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা।
বিদ্যুৎ খাতের এই পরিস্থিতিতে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে নির্ধারণ করা প্রয়োজন কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর, কোনগুলো কম ব্যবহার হচ্ছে এবং কোন কেন্দ্র বন্ধ, পুনর্গঠন বা আধুনিকায়ন করা দরকার। পুরোনো অতিরিক্ত সক্ষমতার সমস্যার সমাধান না করে নতুন সক্ষমতা যুক্ত হলে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা আরও বাড়তে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দক্ষতার ঘাটতি দূর করতে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সংস্কার জরুরি। তাঁর মতে, তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতির পাশাপাশি একই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কাজও শুরু করা প্রয়োজন।
এদিকে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে এলএনজি আমদানির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। নতুন দুটি এফএসআরইউ নির্মাণ হলে আমদানির সক্ষমতা আরও বাড়বে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা বা ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হলে দেশের জ্বালানি ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, দেশে এলএনজি আমদানি শুরুর পর ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত এ খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে ভর্তুকি হিসেবে ব্যয় হয়েছে আরও প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন।
জ্বালানি আমদানিতে দেশের বার্ষিক ব্যয় ইতিমধ্যে ১৩ থেকে ১৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এলএনজি আমদানির পরিমাণ আরও বাড়লে এই ব্যয় ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদেরা। তাঁদের মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টি অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
এ ক্ষেত্রে ভোলার গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ভোলায় এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুত আবিষ্কৃত হয়েছে। এই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রায় ৬০০ কোটি টাকার অর্থায়ন জোগাড় না হওয়ায় প্রকল্পটি এগোয়নি। অন্যদিকে ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে সেখানে নতুন ৪০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পাইপলাইনের মাধ্যমে ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনা গেলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্যুৎকেন্দ্রে তা ব্যবহার করা সম্ভব। এতে বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা কাজে লাগানোর পাশাপাশি স্থানীয় গ্যাসের ব্যবহারও বাড়ানো যেত।
বিপিডিবির আর্থিক দুর্বলতাও বিদ্যুৎ খাতের বড় সমস্যা। দেশের বিদ্যুৎ খাতের একক ক্রেতা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। উৎপাদন ও ক্রয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন পক্ষের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের দায়িত্বও এর ওপর রয়েছে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার ওপর নির্ভরতা বাড়ায় বিপিডিবির নিজস্ব অনেক কেন্দ্রের সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। অথচ এসব কেন্দ্র ও বিপুলসংখ্যক কর্মীর ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।
বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মর্তুজা আহমদ ফারুক চিশতী বলেন, বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতার অন্যতম কারণ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সময় প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি যথাযথভাবে পরিকল্পনায় না নেওয়া। তাঁর মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো বিদ্যমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা।
নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রাশিয়ার অর্থায়নে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখনো উৎপাদনে আসেনি। কেন্দ্রটির উৎপাদন শুরুর সময় একাধিকবার পিছিয়েছে। এর মধ্যে নতুন আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা সরকারের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তায় সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা ইতিবাচক হলেও এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। তাঁর মতে, বিপিডিবি, পিজিসিবি, বিইআরসি, পেট্রোবাংলা ও বিপিসির মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দক্ষতা উন্নয়ন ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও বড় লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। সৌরবিদ্যুৎ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। নেট মিটারিংসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানি ও এলএনজিনির্ভর নতুন অবকাঠামোতে বড় বিনিয়োগ করলে জ্বালানি খাতে কাঙ্ক্ষিত ভারসাম্য তৈরি নাও হতে পারে।
উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোটের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তার সমাধান হিসেবে নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকে একমাত্র পথ হিসেবে দেখা টেকসই নয়। তাঁর মতে, বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, কাঠামোগত সংস্কার এবং ব্যয় সাশ্রয়ী পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
তবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক মূলত আগামী পাঁচ বছরের অগ্রাধিকার নির্ধারণের একটি রূপরেখা। তাই এতে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সংস্কারের বিস্তারিত পরিকল্পনা রাখা হয়নি। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো এসব অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পৃথক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করবে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেন, ফ্রেমওয়ার্কে মূলত কৌশলগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো পৃথক অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করবে। বাস্তবায়নের সময় কোথায় সমস্যা হচ্ছে এবং কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা সম্ভব হবে।
সরকারের এই রোডম্যাপে তাই একদিকে যেমন নতুন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো তৈরির উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা রয়েছে, অন্যদিকে বিদ্যমান ব্যবস্থার অতিরিক্ত সক্ষমতা ও আর্থিক চাপও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকছে। ফলে আগামী পাঁচ বছরে জ্বালানি নিরাপত্তার পরিকল্পনা কতটা সফল হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি স্থানীয় জ্বালানি অনুসন্ধান, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ খাতের দক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে সরকার কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে তার ওপর।
পাহাড়ে নতুন আশার গল্প, ৪০ নারীর হাতে সেলাই মেশিন
স্টাফ রিপোর্টার: সবুজ পাহাড় আর আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে বান্দরবানের প্রত্যন্ত জনপদে বসবাস করা মানুষের জীবন সহজ নয়। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, সীমিত কর্মসংস্থান এবং কৃষিনির্ভর জীবিকার কারণে অনেক পরিবারকে প্রতিনিয়ত নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বহু পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস জুম চাষ। কিন্তু প্রকৃতি ও বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল এই আয়ে সারা বছর সংসারের প্রয়োজন মেটানো কঠিন।
এই বাস্তবতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে পরিবারের নারী ও শিক্ষার্থীদের ওপর। সংসারের সীমিত আয় দিয়ে খাবার, চিকিৎসা ও পড়াশোনার খরচ মেটাতে গিয়ে অনেকেরই নিজের জন্য আলাদা কোনো আয়ের সুযোগ থাকে না। অথচ তাঁদের অনেকেরই রয়েছে কাজ শেখার আগ্রহ এবং নিজের আয় দিয়ে পরিবারকে সহযোগিতা করার স্বপ্ন।
এমন কিছু স্বপ্নবাজ নারীর পাশে দাঁড়িয়েছে বসুন্ধরা শুভসংঘ। সংগঠনটির উদ্যোগে বান্দরবানের আলীকদম ও সদর উপজেলার ৪০ জন অসচ্ছল নারীকে তিন মাসব্যাপী বিনা মূল্যে সেলাই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে একটি করে সেলাই মেশিন। ফলে প্রশিক্ষণ নেওয়া নারীদের জন্য দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আয় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি আলীকদম ও বান্দরবান সদর উপজেলা হলরুমে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁদের হাতে সেলাই মেশিন তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আলীকদম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা, বান্দরবান সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহেদ পারভেজ, বান্দরবান জেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি আমিনুল হক বাচ্চু, বসুন্ধরা শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামানসহ স্থানীয় প্রশাসন, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
পড়াশোনার পাশাপাশি স্বাবলম্বী হতে চান চামমুম
আলীকদম উপজেলার মারানপাড়ার চামমুম ম্রোর জীবন কেটেছে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে। তিন ভাই ও আট বোনের বড় পরিবারের এই তরুণী বর্তমানে আলীকদম কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাবা রেংকাই ম্রো জুম চাষ করেন। তাঁর আয় দিয়েই পরিবারের এত সদস্যের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে হয়।
বড় পরিবারের কারণে ছোটবেলা থেকেই অভাবের বাস্তবতা দেখেছে চামমুম। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হওয়ায় নিজের প্রয়োজনের খরচ মেটানোর জন্যও তাকে পরিবারের ওপর নির্ভর করতে হয়।
এই পরিস্থিতিতে একটি কাজ শেখার সুযোগ খুঁজছিল চামমুম। সেলাই প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর সেই সুযোগ তৈরি হয়েছে। শুধু প্রশিক্ষণ নয়, বসুন্ধরা গ্রুপের পক্ষ থেকে একটি সেলাই মেশিনও পেয়েছে সে।
চামমুমের ভাষায়, পরিবারের সদস্য অনেক। বাবার জুম চাষের আয় দিয়ে সংসারের সব প্রয়োজন মেটানো কঠিন। সেলাই শেখার সুযোগ পেয়ে সে খুশি। এখন পড়াশোনার পাশাপাশি সেলাই করে নিজের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি পরিবারকেও সহযোগিতা করতে চায়।
তার কাছে সেলাই মেশিনটি কেবল একটি যন্ত্র নয়; নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার একটি সুযোগ।
বাবার অসুস্থতার মধ্যেও থামেনি লাইজুর পড়াশোনা
আলীকদম উপজেলার নয়াপাড়া গ্রামের লাইজু আক্তারের জীবনেও অভাব ও দায়িত্বের চাপ কম নয়। লামা কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির এই শিক্ষার্থী ছয় বোনের একজন।
প্রায় ১৩ বছর আগে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে লাইজুর বাবা প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হন। এরপর থেকেই পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে। বাবার নিয়মিত আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবারের বড় বোনদেরই সংসারের দায়িত্ব নিতে হয়।
বড় বোনদের সহযোগিতায় লাইজুর পড়াশোনা চলছে। তবে নিজের সব প্রয়োজনের জন্য পরিবারের দিকে তাকিয়ে থাকতে চায় না সে। তাই লেখাপড়ার পাশাপাশি টিউশনি করে নিজের কিছু খরচ চালায়।
এর মধ্যেই সেলাই শেখার সুযোগ পায় লাইজু। তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে একটি সেলাই মেশিনও পেয়েছে সে। এখন টিউশনের পাশাপাশি সেলাইয়ের কাজ করে আয় করার পরিকল্পনা করছে।
লাইজু মনে করে, বাবার অসুস্থতার কারণে পরিবারের ওপর যে আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে, নিজের আয় দিয়ে তার কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন তার।
মাসিংচিংয়ের স্বপ্ন পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর
বান্দরবান সদর উপজেলার রেনীং পাড়ার মাসিংচিং মার্মাও সেলাই মেশিন পাওয়া ৪০ নারীর একজন। লোটাস শিশু সদন আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর বাবা থোয়াইচিংনু মার্মা একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি হিসেবে কর্মরত।
দুই বোনের পরিবারে সীমিত আয়ের মধ্যেই তাঁদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি একটি দক্ষতা অর্জনের ইচ্ছা ছিল মাসিংচিংয়ের।
সেলাই প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর এখন নিজের একটি মেশিনও রয়েছে তার হাতে। এই মেশিন ব্যবহার করে ভবিষ্যতে আয় করতে চায় সে। নিজের পড়াশোনার খরচে সহযোগিতা করার পাশাপাশি পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখে মাসিংচিং।
মায়ের অনুপস্থিতিতে মেসাইনুর লড়াই
বান্দরবান সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মেসাইনু মার্মার জীবনেও রয়েছে সংগ্রামের গল্প। তাঁর মা অনেক আগেই মারা গেছেন। বাবা সাবাই উ মার্মা কৃষিকাজ করে সংসার চালান।
বাবার সীমিত আয়ের ওপর নির্ভর করেই মেসাইনুর পড়াশোনা চলছে। পরিবারের আর্থিক বাস্তবতা তাঁকে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি একটি কাজ শেখার সুযোগকে তিনি নিজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন।
তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে সেলাই মেশিন পাওয়ায় এখন সেই দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি সেলাই করে আয় করে বাবার আর্থিক চাপ কিছুটা কমাতে চান মেসাইনু।
শ্যামলীর পরিবারেও স্বচ্ছলতার অপেক্ষা
এই উদ্যোগের আরেক উপকারভোগী শ্যামলী তঞ্চঙ্গ্যা বান্দরবান সরকারি কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁর বাবা কদম তঞ্চঙ্গ্যা খুব বেশি আয় করতে পারেন না। পরিবারের ব্যয় মেটাতে এনজিওতে কর্মরত ভাইয়ের আয়ের ওপরও নির্ভর করতে হয় তাঁদের।
এই বাস্তবতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন শ্যামলী। ভবিষ্যতে নিজের আয়ে পরিবারের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার ইচ্ছা তাঁর।
সেলাই প্রশিক্ষণ ও মেশিন পাওয়ার পর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের একটি পথ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আয় করতে পারলে পরিবারে আর্থিকভাবে অবদান রাখা সম্ভব হবে—এমনটাই প্রত্যাশা তাঁর।
প্রশিক্ষণের সঙ্গে মেশিন, তাই তৈরি হলো কাজের সুযোগ
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু সেলাই মেশিন বিতরণ করলে অনেক ক্ষেত্রেই সেটি দীর্ঘমেয়াদে কাজে লাগানো সম্ভব হয় না। এ কারণে মেশিন দেওয়ার আগে নারীদের তিন মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এতে তাঁরা সেলাইয়ের মৌলিক কাজ শেখার পাশাপাশি মেশিন ব্যবহারের বাস্তব অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছেন।
আয়োজকদের মতে, সীমিত আয়ের পরিবার, কর্মসংস্থানের অভাব এবং সংসারের নানা দায়িত্বের কারণে অনেক নারী আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ পান না। তাঁদের একটি ব্যবহারিক দক্ষতা শেখানোর পাশাপাশি সেই দক্ষতা কাজে লাগানোর উপকরণ দেওয়া হলে নিজেদের আয়ের পথ তৈরি করা সহজ হয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা বলেন, প্রান্তিক অঞ্চলের নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য সেলাই প্রশিক্ষণ ও মেশিন দেওয়ার উদ্যোগ সময়োপযোগী। এর মাধ্যমে নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং তাঁরা অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যেতে পারবেন।
বান্দরবান সদর থানার ওসি মো. শাহেদ পারভেজও উদ্যোগটির প্রশংসা করেন। তাঁর মতে, প্রত্যন্ত এলাকার নারীদের বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ ও সেলাই মেশিন দেওয়া তাঁদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথে সহায়তা করবে।
বান্দরবান জেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি আমিনুল হক বাচ্চু বলেন, শুধু মেশিন বিতরণ নয়, তার আগে তিন মাসের বিনা মূল্যের প্রশিক্ষণ দেওয়াটিও গুরুত্বপূর্ণ। এতে উপকারভোগীরা মেশিন ব্যবহারের দক্ষতা অর্জন করেছেন। ফলে সেলাই মেশিন তাঁদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যম হতে পারে।
বসুন্ধরা শুভসংঘ বান্দরবান জেলা শাখার সভাপতি উয়ই সিং মার্মা বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের অনেক নারী নানা সীমাবদ্ধতার কারণে কাজের সুযোগ পান না। তাঁদের দক্ষ করে তুলতে পারলে পরিবার ও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
একটি মেশিন, একটি পরিবারের নতুন সম্ভাবনা
সেলাই মেশিন পাওয়া ৪০ নারীর বড় একটি অংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। তাঁদের মধ্যে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীও রয়েছেন। কারও বাবা জুম চাষ করেন, কারও বাবা কৃষিকাজ করেন, আবার কারও পরিবারে অসুস্থতা বা সীমিত আয়ের কারণে সংসার চালানোই কঠিন।
তাঁদের প্রত্যেকের গল্প আলাদা হলেও স্বপ্ন প্রায় একই—পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, নিজের প্রয়োজনের কিছুটা নিজে মেটানো এবং সুযোগ পেলে পরিবারকে সহযোগিতা করা।
সেলাই মেশিন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের একটি হাতিয়ার হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। তাঁদের মতে, পাহাড়ি এলাকায় নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ এখনো সীমিত। এমন উদ্যোগ যদি ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে শুধু কয়েকটি পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন নয়, নারীদের মধ্যে আত্মনির্ভরতার মানসিকতাও আরও শক্তিশালী হবে।
চামমুম, লাইজু, মাসিংচিং, মেসাইনু কিংবা শ্যামলী—প্রত্যেকের হাতে এখন একটি করে সেলাই মেশিন। তাঁদের কাছে এটি কেবল একটি উপহার নয়। কারও কাছে এটি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অবলম্বন, কারও কাছে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ, আবার কারও কাছে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রথম পুঁজি।
পাহাড়ের কঠিন বাস্তবতার মধ্যে তাই এই ৪০ নারীর হাতে সেলাই মেশিন পৌঁছে দেওয়া যেন নতুন এক সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা কতটা এগিয়ে যেতে পারবেন, তা সময়ই বলবে। তবে শুরুটা হয়েছে—নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে।


