Thursday, ২৪ September ২০২৬
সর্বশেষ
Blog

জাতিসংঘে তারেকের প্রথম ভাষণ, সামনে বাংলাদেশের নতুন বার্তা

বিশেষ প্রতিনিধি: নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সেই মঞ্চে বাংলাদেশের ইতিহাসের তিনটি ভিন্ন সময় যেন এক বিন্দুতে এসে মিলিত হতে যাচ্ছে। চার দশকের বেশি সময় আগে যে মঞ্চে দাঁড়িয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিশ্বব্যবস্থার বৈষম্য, দারিদ্র্য ও উন্নয়নবঞ্চিত মানুষের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, পরে একই আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এবার সেই ধারাবাহিকতায় প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের হয়ে বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তাঁর এই ভাষণ জিয়া পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আনুষ্ঠানিক উপস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে যাচ্ছে।

এই ঘটনাকে শুধু একটি রাষ্ট্রীয় সফর বা নিয়মিত কূটনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক মাত্রাটি পুরোপুরি ধরা পড়বে না। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা, বৈশ্বিক ন্যায়বিচার নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্ন এবং একটি রাজনৈতিক পরিবারের তিন প্রজন্মের আন্তর্জাতিক মঞ্চে উপস্থিতির ধারাবাহিকতা।

গল্পটির প্রথম অধ্যায় শুরু হয়েছিল ১৯৮০ সালে।

সে বছরের ২৬ আগস্ট নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তখন বিশ্ব অর্থনীতি ছিল গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। তেলের মূল্যবৃদ্ধি, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যে বৈষম্য আন্তর্জাতিক আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়। সেই প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমান প্রশ্ন তুলেছিলেন—বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন ও সহযোগিতার এত প্রতিশ্রুতির পরও কেন পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্য ও ক্ষুধার মধ্যে পড়ে থাকবে?

তাঁর সেই প্রশ্ন কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা থেকে উঠে আসেনি। এর পেছনে ছিল সে সময়কার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন-ভাবনার বড় বিতর্ক।

একদিকে ছিল আধুনিকায়ন তত্ত্ব। ডব্লিউ. ডব্লিউ. রস্টোর ‘স্টেজেস অব ইকোনমিক গ্রোথ’ বা প্রবৃদ্ধির পর্যায় তত্ত্বের মতো ধারণায় মনে করা হতো, উন্নয়নশীল দেশগুলো যদি উন্নত বিশ্বের অনুসৃত অর্থনৈতিক কাঠামোর পথে এগোয় এবং প্রয়োজনীয় পুঁজি, প্রযুক্তি ও বৈদেশিক সহায়তা পায়, তাহলে তারা ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক ‘টেক-অফ’-এর পর্যায়ে পৌঁছাতে পারবে।

অন্যদিকে নির্ভরশীলতা তত্ত্ব বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতরে কেন্দ্র ও প্রান্তের অসম সম্পর্ককে সামনে নিয়ে আসে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কাঠামোগত বৈষম্যের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষে নিজেদের অবস্থান বদলানো কঠিন হয়ে পড়ে।

এই বিতর্কের আন্তর্জাতিক প্রতিফলন ছিল ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে ঘোষিত নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বা এনআইইও। পরবর্তী সময়ে উত্তর-দক্ষিণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। ১৯৮০ সালের জাতিসংঘের ১১তম বিশেষ অধিবেশনেও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও নতুন অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশ তখন ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত, দারিদ্র্যপীড়িত ও খাদ্যসংকটে থাকা একটি নবীন রাষ্ট্র। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের অভিঘাত তখনো গভীর। প্রায় সাড়ে নয় কোটি মানুষের দেশটির সামনে খাদ্য উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

এই বাস্তবতায় জিয়াউর রহমানের বক্তব্যে উঠে আসে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ন্যায্য অংশীদারির প্রশ্ন। তিনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, উন্নয়ন সহায়তা, ঋণ, জ্বালানি ও বাজারসুবিধার ক্ষেত্রে অধিকতর ন্যায্য ব্যবস্থা চেয়েছিলেন। দরিদ্র দেশগুলোর ওপর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের চাপ কমাতে উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে—এমন ধারণাও তিনি সামনে আনেন।

এখানে তাঁর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আত্মনির্ভরতার ধারণা। তাঁর কাছে আত্মনির্ভরতা মানে বিশ্বের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়; বরং নিজেদের উৎপাদন ও সক্ষমতা বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় সমান মর্যাদায় অংশ নেওয়া।

অর্থাৎ একদিকে তিনি বৈশ্বিক সহযোগিতা ও ন্যায্য বাণিজ্যের দাবি তুলেছেন, অন্যদিকে দেশের কৃষি, খাদ্য উৎপাদন ও নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এই দুইয়ের সমন্বয় তাঁর আন্তর্জাতিক বক্তব্যকে একটি স্বতন্ত্র মাত্রা দিয়েছিল।

জিয়াউর রহমানের সেই বক্তব্যের প্রায় ১৩ বছর পর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন তাঁর স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর ৪৮তম সাধারণ অধিবেশনে তাঁর ভাষণের মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্মের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়।

এরপর ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর স্মারক অধিবেশন, ২০০২ সালে শিশু বিষয়ক বিশেষ অধিবেশন এবং ২০০৫ সালে ৬০তম সাধারণ অধিবেশনের বিভিন্ন আয়োজনে তিনি বক্তব্য দেন। অর্থাৎ ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জাতিসংঘ মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অবস্থান ও অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার ধারাবাহিকতা তৈরি করে।

এবার সেই ধারাবাহিকতায় যুক্ত হচ্ছে তৃতীয় প্রজন্ম।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে তিনি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে ভাষণ দেবেন। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নবযাত্রা, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নারী ও যুব ক্ষমতায়ন, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট, আধুনিক প্রযুক্তির ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারের মতো বিষয় স্থান পাবে।

এই বিষয়গুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়, ১৯৮০ সালের বাংলাদেশের সঙ্গে ২০২৬ সালের বাংলাদেশের বাস্তবতার পার্থক্য কতটা।

জিয়াউর রহমানের সময় আন্তর্জাতিক ন্যায়ের আলোচনায় প্রধান প্রশ্ন ছিল খাদ্য, তেল, বাণিজ্য, উন্নয়ন সহায়তা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য। চার দশক পর সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, কার্বন নিঃসরণ, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল বৈষম্য, জলবায়ু অর্থায়ন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো নতুন বাস্তবতা।

বিশেষ করে জলবায়ু বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যু।

২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে ‘Climate Action and the Just Transition’ বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী অংশ নেবেন। পরদিন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত ঝুঁকি নিয়ে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি উদ্বোধনী বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি নিছক পরিবেশনীতি নয়। উপকূলীয় এলাকার মানুষের বসতি, কৃষি, পানির নিরাপত্তা, জীবিকা এবং অভিবাসনের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অংশ তুলনামূলকভাবে খুবই কম। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের ঝুঁকি দেশটির জন্য অনেক বেশি। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা, নদীভাঙন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি—এসবের সম্মিলিত প্রভাব বাংলাদেশের উন্নয়নকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, শুধু ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। ফলে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ক্ষয়ক্ষতির ন্যায্য দায়বণ্টনের প্রশ্ন বাংলাদেশের কূটনীতিতে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এখানেই ১৯৮০ সালের উন্নয়ন-ন্যায়ের প্রশ্নটি নতুন রূপে ফিরে আসে। তখন প্রশ্ন ছিল দরিদ্র দেশগুলোর জন্য ন্যায্য বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহায়তা নিশ্চিত করা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—যেসব দেশ জলবায়ু পরিবর্তনে তুলনামূলকভাবে কম অবদান রেখেছে, তাদের অভিযোজনের ব্যয় কে বহন করবে এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও অর্থায়ন কীভাবে নিশ্চিত হবে?

প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশ্ন সামনে আসছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অবকাঠামো ও নতুন প্রযুক্তি বিশ্ব অর্থনীতির চরিত্র দ্রুত বদলে দিচ্ছে। কিন্তু প্রযুক্তির সুফল সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত নয়।

বিধি অনুযায়ী বৈধ করার বিষয়টি বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।

তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের সুবিধা নিশ্চিত করাই কমিটির অন্যতম লক্ষ্য। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করতে কমিটির সদস্যরা অঙ্গীকারবদ্ধ। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ও কমিটির সঙ্গে একমত হয়েছে।

সংসদ সদস্য ইকবাল জানান, কমিটির প্রথম বৈঠক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

Related news

সেটেলমেন্ট ছাড়া শেখ হাসিনা কি বাংলাদেশে ফিরবেন? ভারতের স্বার্থ রক্ষায় আওয়ামীলীগ! রাজনীতি

সেটেলমেন্ট ছাড়া শেখ হাসিনা কি বাংলাদেশে ফিরবেন? ভারতের স্বার্থ রক্ষায় আওয়ামীলীগ!

মো. আহাদ শিকদার: রাজনীতিতে শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তনের খবর অনলাইন এবং টকশোতে সয়লাব হচ্ছে! বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতাকাঠামো এবং…

admin · September ২২, ২০২৬, ১২:৫৮ pm

অপচয় কমিয়ে বিশ্বদরবারে নতুন বাংলাদেশ রাজনীতি

অপচয় কমিয়ে বিশ্বদরবারে নতুন বাংলাদেশ

বিশেষ প্রতিনিধি: জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের দীর্ঘদিনের একটি চিত্র ছিল—বড় বহর, দীর্ঘ সফর, বিপুল রাষ্ট্রীয় ব্যয়…

admin · September ২০, ২০২৬, ৮:৫২ am

রামপালের ৮০ লাখ টন কয়লা: দরপত্র ঘিরে বাড়ছে প্রশ্ন Blog

রামপালের ৮০ লাখ টন কয়লা: দরপত্র ঘিরে বাড়ছে প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিনিধি: রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ৮০ লাখ মেট্রিক টন কয়লা আমদানির আন্তর্জাতিক দরপত্রের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ…

admin · September ১২, ২০২৬, ৪:৫২ pm

Leave a comment