মো. আহাদ শিকদার: রাজনীতিতে শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তনের খবর অনলাইন এবং টকশোতে সয়লাব হচ্ছে! বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতাকাঠামো এবং ভারতের সাথে রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রশ্ন বারবার সামনে এসেছে। বর্তমান বাস্তবতায় তাই প্রশ্ন উঠছে, শেখ হাসিনা যদি আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরতে চান, তবে সেটি কি কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া সম্ভব হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে অতীতের দিকে তাকাতে হবে।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শেখ হাসিনা কয়েক বছর ভারতে অবস্থান করেন। আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর ১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন।
সেই সময় বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের পটভূমিও গুরুত্বপূর্ণ। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ হয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধীর এবং জিয়াউর রহমানের সেটেলমেন্টের মধ্যেই হাসিনার প্রত্যাবর্তন ঘটে। হাসিনা বাংলাদেশে রাজনীতি করতে পারবে এমন শর্তে হাসিনা দেশে ফিরেন। যার মাত্র ১৩ দিন পরেই জিয়াউর রহমান কে হত্যা করা হয়।
তারপরও একটি বিষয় পরিষ্কার। হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের সেই থেকে এবং তার পরিবার স্বাধীনতার আগে/পরে থেকেই দিল্লির দাসত্ব শুরু করেছিলো।
২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেনের সময় একই ধরনের প্রশ্ন আবার সামনে আসে।
২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান জেনারেল মঈনুল ইউ আহমেদ এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রনব মুখার্জি হাসিনার জন্য সেটেলমেন্ট করেছিলেন। এ কারণেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি ব্যাখ্যা প্রচলিত আছে যে ওয়ান ইলেভেনের রাজনৈতিক বন্দোবস্ত এবং হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে দিল্লির ভূমিকা ছিল পাক্ষিক। কারণ ভারতের চোখে বাংলাদেশে আওয়ামী ছাড়া তারা কোন রাজনৈতিক দলকে বিশ্বাস করতে পারে না।
২০০৯ সালের পর শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক নিরাপত্তা, যোগাযোগ, বন্দর, বিদ্যুৎ, ট্রানজিট, বাণিজ্য এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ বহু ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়। যেগুলো ছিল ভারতের স্বার্থ রক্ষা।
যেমন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য পরিবহনে বাংলাদেশের বন্দর ও ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিলো। যা ছিলো আমাদের দেশের স্বার্বভৌমত্ত্বের জন্য হুমকি।
একইভাবে বাংলাদেশে Coastal Surveillance Radar System স্থাপনের জন্যও ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সমঝোতা নাটক হয়েছিলো। এসব চুক্তিকে আঞ্চলিক connectivity, trade এবং পারস্পরিক অর্থনৈতিক সুবিধার অংশ হিসেবে দেখেছেন।
কিন্তু বাংলাদেশ বিনিময়ে তার কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সমপরিমাণ সুবিধা পেয়েছে কি না।এই প্রশ্নটিই বাংলাদেশের ভারতনীতি নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা উচিত। সম্পর্ক নাকি নির্ভরশীলতা?
প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক প্রয়োজন ন্যায্যতার ভিত্তিতে। ভূগোল পরিবর্তন করা যায় না। বাণিজ্য, পানি, সীমান্ত, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ এবং নিরাপত্তাসহ বহু ক্ষেত্রে দুই দেশ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
একতরফা নির্ভরশীলতার বিষয় নয়।
বাংলাদেশে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তিস্তার পানিবণ্টন, সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু, বাণিজ্যের অশুল্ক বাধা, ট্রানজিট সুবিধা, নদীর পানি, জ্বালানি নির্ভরতা এবং বিভিন্ন কৌশলগত চুক্তির পারস্পরিকতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
আমি মনেকরি, দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে সরকার অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দরকষাকষির সক্ষমতা যথেষ্টভাবে ব্যবহার করেনি। ভারতের স্বার্থ রক্ষা করেছে বিনিময়ে রাতের ভোটে, বিনা ভোটে আওয়ামীলীগ কে ক্ষমতায় রেখেছে।
বাংলাদেশের NID, ড্রাইভিং লাইসেন্স, সরকারি তথ্যপ্রযুক্তির নথিপত্র এবং সংবেদনশীল নাগরিক তথ্য কেন ভারতীয় প্রতিষ্ঠান বা অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হবে?।
বাংলাদেশের নাগরিকদের biometric বা ব্যক্তিগত তথ্য ভারতের হাতে আছে এটা অত্যন্ত গুরুতর। নির্দিষ্ট contract, data-processing arrangement এবং server architecture যাচাই করে প্রকাশ করা উচিৎ। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সেটাকে ঘুরিয়ে রেখেছে।
বাংলাদেশের নাগরিকদের সংবেদনশীল তথ্য কোথায় সংরক্ষিত হবে, কারা তা process করবে এবং রাষ্ট্র কীভাবে digital sovereignty নিশ্চিত করবে? এটা একান্তই আমাদের দেশের ব্যাপার। এখানে ভারত কেন সিদ্ধান্ত নিবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ভারতনীতি নয়। এনসিপি, বিএনপি, জামায়াত, এবি পার্টিসহ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের জাতীয় স্বার্থ সম্পর্কে নিজস্ব অবস্থান রয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের পছন্দের রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না।
দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক প্রয়োজন। একইভাবে বেইজিং, ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস, ইসলামাবাদ, টোকিও এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গেও বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক প্রয়োজন। তবে নীতির কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত বাংলাদেশ।
তাহলে শেখ হাসিনা কি আবার ফিরবেন?
ইতিহাস সরলরেখায় চলে না। ১৯৮১ আর ২০০৭ সালের বাংলাদেশ আজকের বাংলাদেশ নয়। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও বদলেছে। বাংলাদেশে যারা ভারতীয় চড় আছেন? তারা কি হাসিনাকে দেশে ফিরাবে এই স্বত্তে কেউ ভারতের সায়হে সেটেলমেন্ট করবে?। প্রত্যাবর্তন কি শুধুই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইনি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে, নাকি দিল্লি-ঢাকা সমীকরণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে?
আমার ব্যাক্তিগত মতামত থেকে লিখছি, হাসিনা দেশে ফিরবেন না। এটা একটা ন্যারেটিভস যার মাধ্যম হাজারো নিরীহ কর্মীদের জীবন দূর্বিষহ করে তুলবে।প্রশ্ন হলো, আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোথায়। আমি বলবো দিল্লি, আওয়ামীলীগের জন্ম থেকেই তারা দিল্লির পারপাস সাফ করে আসছেন।
২৪শে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হাসিনার পতন হওয়ার পর বাংলাদেশের ডিজিএফআইয়ের চিফ, এসএসএফ এর চিফ এবং হাসিনার সাময়িক সচিব কে ভারত ক্যান্টরমেন্ট এ আশ্রয় দিয়েছে। যা বাংলাদেশের স্বার্বভৌমত্ত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি। এবং ভারত প্রতিনিয়ত বাংলাদেশকে অসহযোগিতা করছে। যেমন বর্ডার থেকে পুশ ইন করছে। আওয়ামী সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দিচ্ছে। অতি উৎসাহি পুলিশ অফিসার যেমন বিপ্লব কুমার, হারুন, মনিরুল সহ এদের সবাইকে আশ্রয় দিয়েছে। এবং এরাই প্রতিনিয়ত জন-জীবনে ভোগান্তির পরিকল্পনা করছে।পরিশেষে বলবো আওয়ামীলীগ এবং ভারত এরা একে অপরকে বন্ধু হয়েই আছে। ভারত বাংলাদেশকে তার অংগরাজ্য মনেকরে যদি আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকে।
লেখক: মো. আহাদ শিকদার
আহবায়ক এনসিপি ফিনল্যান্ড শাখা


